প্রতিযোগিতা মূলক পরীক্ষায় পদার্থবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হল ‘পরিমাপ, একক ও মাত্রা’ (Measurement, Units and Dimension)। বিগত বছরের পিএসসি (PSC) প্রশ্নপত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভৌতরাশির শ্রেণীবিন্যাস, CGS ও SI এককের রূপান্তর, বিভিন্ন মাত্রা (Dimensions) এবং অতি ক্ষুদ্র বা বৃহৎ মহাজাগতিক দূরত্ব পরিমাপের একক থেকে প্রতি বছরই 1 থেকে 2 টি প্রশ্ন নিশ্চিতভাবে আসে।
আজকের এই বিস্তারিত ব্লগে আমরা WBPSC Miscellaneous, WBCS, Rail, WB Police এছাড়াও বিভিন্ন পরীক্ষার সিলেবাস ও নম্বর বিভাজনকে মাথায় রেখে ‘পরিমাপ, একক ও মাত্রা’ অধ্যায়ের প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয় সহজ ভাষায় আলোচনা করব।
1. ভৌতরাশি কী এবং এর সাধারণ ধারণা?
আমাদের চারপাশে পর্যবেক্ষণযোগ্য প্রকৃতিতে যা কিছু প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পরিমাপ করা সম্ভব, তাকেই ভৌতরাশি বা প্রাকৃতিক রাশি (Physical Quantity) বলা হয়। উদাহরণস্বরূপ—কোনো ঘরের তাপমাত্রা, একটি টেবিলের দৈর্ঘ্য, বা একটি বস্তুর ওজন। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, মানুষের আবেগ, অনুভূতি, রাগ, বা ভালোবাসা—এগুলো পরিমাপ করা যায় না বলে এগুলো কোনো ভৌতরাশি নয়।
পরিমাপের গাণিতিক প্রকাশ :
যেকোনো ভৌতরাশিকে সঠিকভাবে প্রকাশ করার জন্য মূলত দুটি উপাদানের প্রয়োজন হয়:
সংখ্যামান (Numerical Value): যা নির্দেশ করে পরিমাপটি কতটা ছোট বা বড়।
একক (Unit): একটি প্রমিত বা নির্দিষ্ট মান, যার সাথে তুলনা করে রাশিটি মাপা হয়।
2. ভৌতরাশির শ্রেণীবিন্যাস:
ভৌতরাশিকে তাদের অভিমুখ বা দিকের ওপর নির্ভর করে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়: (a) স্কেলার রাশি (Scalar Quantity) এবং (b) ভেক্টর রাশি (Vector Quantity)
(a) স্কেলার রাশি (Scalar Quantity) :
যেসব ভৌতরাশিকে সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করার জন্য কেবলমাত্র মানের প্রয়োজন হয়, কোনো দিক বা অভিমুখের প্রয়োজন হয় না, তাদের স্কেলার রাশি বলে।
বৈশিষ্ট্য: এগুলোকে সাধারণ বীজগণিতের নিয়ম অনুসারে যোগ, বিয়োগ, গুণ বা ভাগ করা যায়।
গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ: দৈর্ঘ্য, ভর, সময়, ক্ষেত্রফল, আয়তন, ঘনত্ব, তাপমাত্রা, কার্য, শক্তি, ক্ষমতা, দ্রুতি, চাপ।
(b) ভেক্টর রাশি (Vector Quantity):
যেসব ভৌতরাশিকে সঠিকভাবে প্রকাশ করার জন্য মান এবং দিক (অভিমুখ)—দুই-ই নির্দিষ্ট থাকতে হয়, তাদের ভেক্টর রাশি বলে।
বৈশিষ্ট্য: এরা সাধারণ বীজগণিতের নিয়ম মেনে চলে না; এদের যোগ বা বিয়োগের জন্য ভেক্টর বীজগণিত (Vector Algebra) বা ত্রিভুজ/সামান্তরিক সূত্র মেনে চলতে হয়।
গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ: সরণ, বেগ, ত্বরণ, মন্দন, বল, ওজন, ভরবেগ, বলের মুহূর্ত (Torque), মহাকর্ষীয় প্রাবল্য।
3. পরিমাপের একক ও এককের প্রকারভেদ:
কোনো ভৌতরাশির পরিমাপ বোঝাতে যে সর্বজনগ্রাহ্য নির্দিষ্ট মানকে প্রমাণ হিসেবে ধরে নিয়ে তুলনা করা হয়, তাকে ঐ রাশির একক (Unit) বলে।
একক মূলত দুই প্রকার: (a) মৌলিক বা প্রাথমিক একক (Fundamental / Base Units) এবং (b) লব্ধ একক (Derived Units)
a. মৌলিক বা প্রাথমিক একক (Fundamental / Base Units):
যেসব এককের মান অন্য কোনো এককের ওপর নির্ভর করে না এবং যাদের সাহায্যে অন্য যেকোনো রাশির একক গঠন করা যায়, তাদের মৌলিক একক বলে।
আন্তর্জাতিক পরিমাপ পদ্ধতিতে (SI System) মোট 7টি মূল ভৌতরাশি এবং 2টি সম্পূরক (Supplementary) রাশি আছে । মৌলিক এককের উদাহরন:
সম্পূরক এককসমূহ:
সমতল কোণ (Plane Angle): রেডিয়ান(rad)
ঘনকোণ (Solid Angle): স্টেরেডিয়ান (sr)
b. লব্ধ একক (Derived Units):
এক বা একাধিক মৌলিক এককের গুণ বা ভাগের মাধ্যমে যেসব একক তৈরি করা হয়, সেগুলোকে লব্ধ একক বলে।এই এককগুলো মৌলিক এককের উপরে নির্ভরশীল । কয়েকটি লব্ধ এককের উদাহরণ :
4. পরিমাপের বিভিন্ন পদ্ধতি (Systems of Units):
CGS পদ্ধতি (Centimetre-Gram-Second): এটিকে ফরাসি বা মেট্রিক পদ্ধতিও বলা হয়। এতে দৈর্ঘ্যের একক সেন্টিমিটার, ভরের একক গ্রাম এবং সময়ের একক সেকেন্ড।
FPS পদ্ধতি (Foot-Pound-Second): এটি ব্রিটিশ পদ্ধতি নামে পরিচিত। এতে দৈর্ঘ্যের একক ফুট, ভরের একক পাউন্ড এবং সময়ের একক সেকেন্ড।
MKS পদ্ধতি (Metre-Kilogram-Second): এতে দৈর্ঘ্যের একক মিটার, ভরের একক কিলোগ্রাম এবং সময়ের একক সেকেন্ড।
SI পদ্ধতি (International System of Units): 1960 সালে আন্তর্জাতিক সম্মেলনের মাধ্যমে MKS পদ্ধতিকে পরিমার্জিত করে বিশ্বজুড়ে SI পদ্ধতি চালু করা হয়।
5. 10-এর বিভিন্ন ঘাত(Power)-এর তালিকা:
ধনাত্মক ঘাত (Multiples):
কিলো (Kilo – k): 10³
মেগা (Mega – M): 10⁶
জিগা (Giga – G): 10⁹
টেরা (Tera – T): 10¹²
পেটা (Peta – P): 10¹⁵
ঋণাত্মক ঘাত (Sub-multiples):
মিলি (Milli – m): 10⁻³
মাইক্রো (Micro – µ): 10⁻⁶
ন্যানো (Nano – n): 10⁻⁹
পিকো (Pico – p): 10⁻¹²
ফার্মি / ফেক্টো (Femto – f): 10⁻¹⁵
6. অতি ক্ষুদ্র ও অতি বৃহৎ দূরত্ব পরিমাপের বিশেষ একক:
অতি ক্ষুদ্র দূরত্ব পরিমাপের একক (Atomic Dimensions) -
মাইক্রন (µm): ব্যাকটেরিয়া ও কোষের আকার পরিমাপে ব্যবহৃত হয়।
1 µm = 10⁻⁶ m = 10⁻⁴ cm = 10⁻³ mm
ন্যানোমিটার (nm): ন্যানোপ্রযুক্তি ও ভাইরাসের আকার মাপতে লাগে।
1 nm = 10⁻⁹ m = 10⁻⁷ cm
অ্যাংস্ট্রম (Å): আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য ও স্ফটিকের গঠন মাপতে ব্যবহৃত হয়।
1 Å = 10⁻¹⁰ m = 10⁻⁸ cm
ফার্মি বা ফেক্টোমিটার (fm): পরমাণুর নিউক্লিয়াসের ব্যাসার্ধ পরিমাপের একক।
1 fm = 10⁻¹⁵ m
জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত অতি বৃহৎ দূরত্ব পরিমাপের একক (Astronomical Units)-
অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল একক (AU): পৃথিবী থেকে সূর্যের মধ্যবর্তী গড় দূরত্বকে 1 AU বলে।
1 AU = 1.496 × 10¹¹ m ≈ 1.5 × 10⁸ km
আলোকবর্ষ (Light Year – ly): শূন্যস্থানে আলো এক বছরে যে পরিমাণ দূরত্ব অতিক্রম করে তাকে আলোকবর্ষ বলে। মনে রাখবেন, আলোকবর্ষ সময়ের নয়, মহাজাগতিক দূরত্বের একক।
দূরত্ব = আলোর বেগ × 1 বছর = (3 × 10⁸ m/s) × (365 × 24 × 60 × 60 s)
1 ly = 9.46 × 10¹⁵ m = 9.46 × 10¹² km
পারসেক (Parsec – pc): এটি জ্যোতির্বিজ্ঞানে ব্যবহৃত দূরত্ব পরিমাপের সর্ববৃহৎ একক।
1 Parsec = 3.26 Light Years = 3.086 × 10¹⁶ m = 3.086 × 10¹³ km
এককগুলোর ক্রমিক মান: Parsec > Light Year > Astronomical Unit
7. মাত্রা ও মাত্রীয় সংকেত (Dimensions of Physical Quantities)
কোনো লব্ধ ভৌতরাশিকে মৌলিক রাশিগুলোর ([L] - দৈর্ঘ্য, [M] - ভর, [T] - সময়) উপযুক্ত ঘাত বা পাওয়ার দ্বারা প্রকাশ করার পদ্ধতিকে মাত্রা বলে -
8. এককহীন ভৌতরাশি (Unitless Quantities):
যখন কোনো ভৌতরাশি দুটি সমজাতীয় রাশির অনুপাত হিসেবে গঠিত হয়, তখন তাদের কোনো একক থাকে না। এদেরকে এককহীন রাশি বলা হয়।
গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণসমূহ:
আপেক্ষিক গুরুত্ব বা আপেক্ষিক ঘনত্ব (Relative Density): কোনো পদার্থের ঘনত্ব এবং ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে জলের ঘনত্বের অনুপাত।
পারমাণবিক ভর ও আণবিক ভর (Atomic / Molecular Weight): একটি পরমাণু বা অণুর ভরের সাথে হাইড্রোজেন বা কার্বন পরমাণুর ভরের অনুপাত।
যন্ত্রের যান্ত্রিক সুবিধা (Mechanical Advantage): যন্ত্র দ্বারা প্রযুক্ত ভার এবং প্রয়োগ করা বলের অনুপাত।
প্রতিসরাঙ্ক (Refractive Index): শূন্যস্থানে আলোর বেগ এবং নির্দিষ্ট মাধ্যমে আলোর বেগের অনুপাত।
বিকৃতি (Strain): বল প্রয়োগের ফলে আকারের পরিবর্তন এবং প্রাথমিক আকারের অনুপাত।
9. কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:
সিজিএস ও এসআই উভয় পদ্ধতিতে একই একক: সময় (সেকেন্ড)।
1 নিউটন ও ডাইনের সম্পর্ক: 1 N = 10⁵ dynes (বা 10,00,000 ডাইন)।
1 জুল ও আর্গের সম্পর্ক: 1 J = 10⁷ ergs।
পরম শূন্য তাপমাত্রা: 0 K বা -273.15 °C (কেলভিন স্কেলে ডিগ্রি চিহ্ন ব্যবহার করা হয় না)।
প্রমাণ কিলোগ্রাম: ফ্রান্সে রক্ষিত প্ল্যাটিনাম-ইরিডিয়াম (90:10) সংকর ধাতুর তৈরি বেলনের ভর অথবা 4 °C (বা 277 K) উষ্ণতায় 1 লিটার বিশুদ্ধ জলের ভর।
সমমাত্রার দুটি ভিন্ন রাশি: কার্য এবং শক্তি—দুটিরই মাত্রীয় সংকেত [M L² T⁻²]। একইভাবে বল এবং ওজনের মাত্রা একই [M L T⁻²]।
10. প্র্যাকটিস সেট (10 টি গুরুত্বপূর্ণ MCQ) :
প্রশ্ন 1. নিচের কোনটি ভেক্টর রাশি নয়?
(A) ভরবেগ
(B) ওজন
(C) সরণ
(D) গতিশক্তি
উত্তর: (D) গতিশক্তি (এটি একটি স্কেলার রাশি)
প্রশ্ন 2. আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য প্রকাশের জন্য সুবিধাজনক একক কোনটি?
(A) ফার্মি
(B) অ্যাংস্ট্রম
(C) বার্ন
(D) পারসেক
উত্তর: (B) অ্যাংস্ট্রম (1 Å = 10⁻¹⁰ m)
প্রশ্ন 3. নিচের কোনটি দূরত্বের একক নয়?
(A) আলোকবর্ষ
(B) পারসেক
(C) অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট
(D) জুল
উত্তর: (D) জুল (এটি শক্তির একক)
প্রশ্ন 4. সিজিএস (CGS) পদ্ধতিতে চাপের একক কী?
(A) পাস্কাল
(B) ডাইন/সেমি²
(C) নিউটন/মিটার²
(D) আর্গ
উত্তর: (B) ডাইন/সেমি²
প্রশ্ন 5. এক পারসেক সমান কত আলোকবর্ষ?
(A) 9.46 × 10¹²
(B) 1.496 × 10⁸
(C) 3.26
(D) 10⁵
উত্তর: (C) 3.26 আলোকবর্ষ
প্রশ্ন 6. পরমাণুর নিউক্লিয়াসের আকার প্রকাশের জন্য কোন এককটি ব্যবহৃত হয়?
(A) মাইক্রন
(B) ন্যানোমিটার
(C) ফার্মি
(D) মিটার
উত্তর: (C) ফার্মি (1 fm = 10⁻¹⁵ m)
প্রশ্ন 7. যন্ত্রের ‘যান্ত্রিক সুবিধা’ (Mechanical Advantage)-এর একক কী?
(A) নিউটন
(B) ডাইন
(C) ওয়াট
(D) এটি এককহীন রাশি
উত্তর: (D) এটি এককহীন রাশি
প্রশ্ন 8. শক্তির মাত্রীয় সংকেত (Dimensional Formula) কোনটি?
(A) [M L T⁻¹]
(B) [M L² T⁻²]
(C) [M L⁻¹ T⁻²]
(D) [M L² T⁻³]
উত্তর: (B) [M L² T⁻²]
প্রশ্ন 9. 1 মেগাওয়াট (MW) সমান কত ওয়াট?
(A) 10³ W
(B) 10⁶ W
(C) 10⁹ W
(D) 10¹² W
উত্তর: (B) 10⁶ W
প্রশ্ন 10. SI পদ্ধতিতে দীপন প্রাবল্যের (Luminous Intensity) একক কী?
(A) ক্যান্ডেলা
(B) অ্যাম্পিয়ার
(C) কেলভিন
(D) মোল
উত্তর: (A) ক্যান্ডেলা (cd)
