পরিবেশবিদ্যা হলো বিজ্ঞানের সেই আধুনিক ও গতিশীল শাখা, যেখানে সজীব উপাদান (জীব) এবং নির্জীব পরিবেশের (বায়ু, জল, মাটি, তাপমাত্রা, আলো) মধ্যে নিবিড় আন্তঃসম্পর্ক ও শক্তির আদান-প্রদান নিয়ে আলোচনা করা হয়। অর্থাৎ জীববিজ্ঞান যে শাখায় কোনো নির্দিষ্ট পরিবেশের সজীব (জীবীয়) উপাদান এবং নির্জীব (অজৈব) উপাদানের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক, সংবেদনশীলতা ও পারস্পরিক নির্ভরতা নিয়ে আলোচনা করে, তাকে বাস্তুবিদ্যা বা ইকোলজি (Ecology) বলে।
শব্দউৎপত্তি:
‘Ecology’ শব্দটি গ্রিক শব্দ Oikos এবং Logos থেকে এসেছে।
- Oikos – যার অর্থ ‘বাসস্থান’ বা ‘ঘর’ (Home/Habitation)।
- Logos – যার অর্থ ‘অধ্যয়ন’ বা ‘জ্ঞান’ (Study/Knowledge)।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:
- বিজ্ঞানী আর্নস্ট হেকেল (Ernst Haeckel, 1866): প্রথম ‘Ecology’ শব্দটি প্রবর্তন ও ব্যাখ্যা করেন।
- বিজ্ঞানী এ. জি. ট্যান্সলে (A. G. Tansley, 1935): প্রথম ‘Ecosystem’ (বাস্তুতন্ত্র) শব্দটি প্রবর্তন করেন।
- ইউজিন ওডাম (Eugene Odum): আধুনিক পরিবেশবিদ্যার জনক (Father of Modern Ecology) নামে পরিচিত।
বাস্তুসংস্থানিক সংগঠনের স্তরসমূহ (Levels of Ecological Organization):
প্রকৃতিতে ক্ষুদ্রতম একক থেকে শুরু করে বৃহৎ পরিসর পর্যন্ত জীব কীভাবে সাজানো থাকে, তাকে 6টি প্রধান স্তরে ভাগ করা হয়। স্তর গুলি হল –
A. একক জীব স্তর (Individual / Organism Level)
B. পপুলেশন স্তর (Population Level)
C. কমিউনিটি স্তর (Community Level)
D. বাস্তুতান্ত্রিক স্তর (Ecosystem Level)
E. বায়োম স্তর (Biome Level)
F. বায়োস্ফিয়ার বা জীবমণ্ডল (Biosphere Level)
A. একক জীব স্তর (Individual / Organism Level):
বাস্তুতন্ত্রের সবচেয়ে মৌলিক ও ক্ষুদ্রতম রূপ হলো একক জীব। পরিবেশের ভৌত ও জৈব রাসায়নিক পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে চলতে প্রতিটি একক জীবকে নিজস্ব উপায়ে অঙ্গসংস্থানিক ও শারীরবৃত্তীয় অভিযোজন (Adaptation) চালাতে হয়।
B. পপুলেশন স্তর (Population Level):
একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলে, নির্দিষ্ট সময়ে বসবাসকারী একই প্রজাতির সমস্ত জীবের সমষ্টিকে পপুলেশন বলে।
উদাহরণ: কোনো নির্দিষ্ট বনের সমস্ত সাপের সমষ্টি বা কোনো পুকুরের সমস্ত রুই মাছের সংখ্যা।
Autecology: পরিবেশবিদ্যার যে শাখায় শুধুমাত্র একটি একক প্রজাতি বা নির্দিষ্ট পপুলেশনের সাথে তার পরিবেশের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হয়, তাকে আউটইকোলজি(Autecology) বলে।
C. কমিউনিটি স্তর (Community Level):
একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির একাধিক পপুলেশন যখন একসাথে বসবাস করে ও পরস্পরের ওপর নির্ভর করে, তাকে কমিউনিটি বা জীবসম্প্রদায় বলে।
উদাহরণ: একটি জলাশয়ের জলজ উদ্ভিদ, মাছ, ব্যাঙ, অনুজীব এবং পতঙ্গ—সবাই মিলে পুকুরের জীবসম্প্রদায় গড়ে তোলে।
Synecology: পরিবেশবিদ্যার যে শাখায় সমগ্র কমিউনিটি বা একাধিক প্রজাতির সমন্বয়ে গঠিত জীবগোষ্ঠীর সাথে পরিবেশের সম্পর্ক অধ্যয়ন করা হয়, তাকে সিনইকোলজি(Synecology) বলে।
D. বাস্তুতান্ত্রিক স্তর (Ecosystem Level):
বাস্তুতন্ত্র হলো এমন একটি স্বায়ত্তশাসিত গঠনগত ও কার্যগত একক, যেখানে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের জীব সম্প্রদায় (Biotic Community) এবং অজৈব পরিবেশ (Abiotic Environment) শক্তিপ্রবাহ ও উপাদান চক্রের মাধ্যমে যুক্ত থাকে।
E. বায়োম স্তর (Biome Level):
একই ধরণের জলবায়ু, একই ধরণের মৃত্তিকা এবং প্রায় একই বৈচিত্র্যের উদ্ভিদ ও প্রাণী দ্বারা গঠিত বিশাল ভৌগোলিক অঞ্চলকে বায়োম বলে।
উদাহরণ: তুন্দ্রা বায়োম, ক্রান্তীয় বৃষ্টিঅরণ্য (Tropical Rainforest), মরু বায়োম।
F. বায়োস্ফিয়ার বা জীবমণ্ডল (Biosphere Level):
পৃথিবীর যে সমস্ত অংশে জীবের অস্তিত্ব রয়েছে, সেই সমগ্র অংশকে একত্রে বায়োস্ফিয়ার বা জীবমণ্ডল বলে। এটি পৃথিবীর সর্ববৃহৎ বাস্তুতান্ত্রিক একক।
পরিবেশের অজৈব উপাদান ও জীবের বিশেষ অভিযোজন (Abiotic Factors & Adaptations):
জীবের বেঁচে থাকা এবং তাদের বিস্তৃতি পরিবেশের অজৈব বা অজীবীয় (Abiotic) উপাদানগুলোর ওপর সরাসরি নির্ভর করে। যেমন:
আলো:
আলো শালোকসংশ্লেষ, বাষ্পমোচন, প্রজনন এবং দৈনন্দিন আচরণের প্রধান নিয়ন্ত্রক। প্রত্যেকটি সবুজ উদ্ভিদ খাদ্য উৎপাদনের জন্য সরাসরি সূর্যালোকের উপরে নির্ভরশীল। সূর্যালোকের উপস্থিতি এর ওপরে নির্ভর করে এই উদ্ভিদের কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয় । ভাগগুলি হলো –
আদ্রতা ও জল (Humidity & Water):
জাঙ্গল উদ্ভিদ বা জেরোফাইট (Xerophytes): মরুভূমিতে জলের অভাব পূরণ করতে এদের পাতা কাটায় বা পুরু কিউটিকলে রূপান্তরিত হয় (যেমন: ফণীমনসা)। এদের কাণ্ড রসালো হয়, যা জল সঞ্চয় করে।
পর্ণমোচী উদ্ভিদ (Deciduous Plants): শীতকালে বাতাসে আপেক্ষিক আদ্রতা কমে গেলে বাষ্পমোচন রোধ করতে এরা পাতা ঝরিয়ে দেয় (যেমন: শাল, সেগুন, শিমুল)।
মরু প্রাণীর অভিযোজন: অস্ট্রেলিয়ার ‘মোলক হরিডাস’ নামক গিরগিটি ত্বকের সাহায্যে বায়ুমণ্ডলের জলীয় বাষ্প শোষণ করে। ক্যাঙ্গারু র্যাট শরীরের চর্বি জারিত করে উৎপন্ন বিপাকীয় জল (Metabolic Water) দিয়ে জলের চাহিদা মেটায়।
তাপমাত্রা (Temperature):
হাইবারনেশন (Hibernation / শীতঘুম): অতিরিক্ত ঠান্ডায় জীবনধারণ বজায় রাখতে কিছু প্রাণীর হৃদস্পন্দন ও বিপাকীয় হার চরম মাত্রায় কমে যায়, একে হাইবারনেশন বা শীতঘুম বলে ।(যেমন: মেরু ভালুক, ব্যাঙ, গিরগিটি)।
এস্টিভেশন (Aestivation / গ্রীষ্মঘুম): তীব্র গ্রীষ্ম ও জলের সংকটে কিছু প্রাণীদের দীর্ঘ নিষ্ক্রিয়তা লক্ষ্য করা যায়, একে এস্টিভেশন বা গ্রীষ্মঘুম বলে। (যেমন: কুমির, আফ্রিকান লাংফিশ, ঝিনুক)।
গ্লোগারের নিয়ম (Gloger’s Rule): এই নিয়মানুযায়ী উষ্ণ ও আদ্র অঞ্চলের প্রাণীদের দেহে মেলানিন রঞ্জক বেশি থাকার কারণে গায়ের রঙ গাঢ় হয়।
অ্যালেনের নিয়ম (Allen’s Rule): এই নিয়মানুসারে শীতল অঞ্চলের স্তন্যপায়ী প্রাণীদের কান, পা ও লেজ ছোট হয়, যাতে দেহতাপ কম নষ্ট হয়।
পপুলেশনের বৈশিষ্ট্য ও গতিবিদ্যা (Population Dynamics):
পপুলেশন স্তরে সংখ্যা ও আকৃতির পরিবর্তন বোঝার জন্য নিম্নলিখিত সূচকগুলি গুরুত্বপূর্ণ:
কমিউনিটিতে প্রজাতিসমূহের আন্তঃক্রিয়া (Biological Interactions):
কমিউনিটিতে ভিন্ন প্রজাতিগুলির মধ্যে ধনাত্মক, ঋণাত্মক বা নিরপেক্ষ যোগাযোগ গড়ে ওঠে:
পরীক্ষায় আসতে পারে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ MCQ:
বিগত বছরের প্র্যাকটিস প্রশ্ন ও উত্তর (WBPSC Selected MCQs)
প্রশ্ন 1. ‘Ecosystem’ (বাস্তুতন্ত্র) শব্দটি প্রথম কোন বিজ্ঞানী প্রবর্তন করেন?
(A) আর্নস্ট হেকেল
(B) এ. জি. ট্যান্সলে
(C) ইউজিন ওডাম
(D) রামদেও মিশ্র
উত্তর: (B) এ. জি. ট্যান্সলে
প্রশ্ন 2. আলোর উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে যেসব উদ্ভিদ ছায়াঘেরা স্থানে জন্মায় তাদের কী বলা হয়?
(A) হেলিওফাইট
(B) মেসোফাইট
(C) সিওফাইট
(D) সামোফাইট
উত্তর: (C) সিওফাইট
প্রশ্ন 3. নিচের কোনটি মিউচুয়ালিজম (Mutualism)-এর একটি উপযুক্ত উদাহরণ?
(A) আম গাছে অর্কিড
(B) লাইকেন
(C) স্বর্ণলতা
(D) বাঘ ও শিকার
উত্তর: (B) লাইকেন
প্রশ্ন 4. একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে বসবাসকারী বিভিন্ন প্রজাতির পপুলেশনের সমষ্টিকে কী বলা হয়?
(A) বায়োম
(B) কমিউনিটি
(C) বাস্তুতন্ত্র
(D) বায়োস্ফিয়ার
উত্তর: (B) কমিউনিটি
প্রশ্ন 5. প্রজননের সময় অতিরিক্ত গরমে প্রাণীদের নিষ্ক্রিয় থাকাকে কী বলা হয়?
(A) হাইবারনেশন
(B) এস্টিভেশন
(C) ডায়াপজ
(D) মেটামরফোসিস
উত্তর: (B) এস্টিভেশন
