বর্তমান বিশ্বে আন্তর্জাতিক শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের(1st Sep,1939 – 2nd Sep,1945) ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের পর বিশ্বনেতারা উপলব্ধি করেন যে ভবিষ্যতে যুদ্ধ প্রতিরোধ এবং দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রয়োজন। এই চিন্তা থেকেই 1945 সালের 24 অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত হয় জাতিসংঘ বা United Nations (UN)।
জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠা:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলা অবস্থায় লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু এবং বিভিন্ন দেশ তথা মানব সভ্যতার প্রভূত ক্ষতি হয়। যার ফলে বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশগুলি সহ সমগ্র বিশ্ববাসী এমন একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রয়োজন অনুভব যার দ্বারা সমগ্র বিশ্বে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা সম্ভব।ফলস্বরূপ বিশ্বের ৫১টি দেশ একত্রিত হয়ে জাতিসংঘ সনদে (UN Charter) সাক্ষর করে, এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে প্রাথমিক ক্ষেত্রে 50 টি দেশ সান ফ্রান্সিসকো শহরে 26 শে জুন 1945 সালে জাতিসংঘ সনদে (UN Charter) সাক্ষর করে কিন্তু পোল্যান্ড সাক্ষর করে 15 অক্টোবর 1945 সালে। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক শান্তি বজায় রাখা, প্রত্যেকের মানবাধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা। বর্তমানে জাতিসংঘের সদস্য সংখ্যা 193।
জাতিসংঘের প্রধান উদ্দেশ্য :
জাতিসংঘ চারটি মূল লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে—
1. আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা।পুনঃরায় বিশ্বযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে না দেওয়া । প্রত্যেক দেশের স্বাধীনতা রক্ষা এবং এক দেশ অন্য দেশের উপরে আক্রমণ না করে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা ।
2. বিভিন্ন দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখা এবং প্রত্যেক দেশের একে অপরের উন্নতিতে সাহায্য করা।
3. যুদ্ধহীন পৃথিবীতে প্রত্যেক দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানবিক সমস্যার সমাধানে সার্বিক ভাবে সহযোগিতা বৃদ্ধি করা।
4. প্রত্যেক দেশের মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতার প্রতি সম্মান প্রতিষ্ঠা করা এবং তা সুরক্ষিত করা।
জাতিসংঘের গঠন ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো (Structure of the UN):
জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী, জাতিসংঘের লক্ষ্য পূরণের জন্য এবং মূল কাজগুলো সুষ্ঠভাবে পরিচালনার জন্য 6 টি প্রধান অঙ্গ গঠন করা হয়ছে। অঙ্গ গুলো হলো :
- সাধারণ পরিষদ (General Assembly)
- নিরাপত্তা পরিষদ (Security Council)
- অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (The Economic and Social Council)
- আন্তর্জাতিক বিচারালয় (International Court of Justice)
- সচিবালয় (Secretariat)
- ট্রাস্টিশিপ পরিষদ (The Trusteeship Council)
1.সাধারণ পরিষদ (General Assembly):
সাধারণ পরিষদ হলো নীতি-নির্ধারণ ও প্রতিনিধিমূলক অঙ্গ। এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ । জাতিসংঘের 193 টি সদস্য রাষ্ট্রের প্রত্যেকটি রাষ্ট্রই সাধারণ পরিষদ বা General Assembly এর সদস্য । এখানে “এক দেশ, এক ভোট “ নীতি অনুসরণ করা হয় । প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসে নিউইয়র্ক শহরে এর বার্ষিক অধিবেশন বসে । আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, নতুন সদস্য গ্রহণ এবং জাতিসংঘের বাজেট অনুমোদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এখানে নেওয়া হয় ।
2. নিরাপত্তা পরিষদ (Security Council):
বিশ্বে শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার প্রধান দায়িত্ব নিরাপত্তা পরিষদের। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের মোট সদস্য সংখ্যা 15 ।এর মধ্যে 5টি স্থায়ী সদস্য, এই স্থায়ী সদস্য দেশ গুলো হলো যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, চীন ও ফ্রান্স । অস্থায়ী সদস্য দেশ 10 টি (যারা সাধারণ পরিষদ থেকে 2 বছরের জন্য নির্বাচিত হয়)। স্থায়ী 5টি দেশের যেকোনো একটি যদি কোনো প্রস্তাবে নেতিবাচক ভোট দেয়, তবে সেই প্রস্তাবটি বাতিল হয়ে যায়। এই বিশেষ ক্ষমতাকে ‘ভিটো’ বলা হয়।
3.অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (The Economic and Social Council):
বিশ্বজুড়ে অনুন্নত বা উন্ননয়নশীল দেশগুলোতে দরিদ্রতা দূরীকরণ এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এছাড়াও শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিভিন্ন দেশের মধ্যে বৃদ্ধি করতে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ কাজ করে। সাধারণ পরিষদ কর্তৃক নির্বাচিত 54 টি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে এই পরিষদ গঠিত।
4.আন্তর্জাতিক বিচারালয় (International Court of Justice):
এটি জাতিসংঘের প্রধান বিচারবিভাগীয় অঙ্গ। নেদারল্যান্ডসের হেগ (The Hague) শহরে এর সদর দপ্তর অবস্থিত। এটি আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে আইনি বিরোধের নিষ্পত্তি করে এবং জাতিসংঘ সংস্থাসমূহকে পরামর্শমূলক মতামত দেয়।
5. সচিবালয় (Secretariat):
জাতিসংঘের দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা করে সচিবালয়। এর প্রধান হলেন মহাসচিব (Secretary-General), যিনি নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশক্রমে সাধারণ পরিষদ দ্বারা 5 বছরের জন্য নিযুক্ত হন।
6. ট্রাস্টিশিপ পরিষদ (The Trusteeship Council):
পরাধীন ও স্বায়ত্তশাসনহীন এলাকাগুলোকে স্বাধীনতা অর্জনে সহায়তা করার জন্য এই ট্রাস্টিশিপ পরিষদ বা The Trusteeship Councile গঠন করা হয়েছিল।1994 সালে বিশ্ব থেকে পরাধীন ট্রাস্ট অঞ্চলগুলোর বিলুপ্তি ঘটার পর থেকে এর কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে।
বিশ্ব শান্তিতে জাতিসংঘের ভূমিকা:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের পর বিশ্বনেতারা উপলব্ধি করেন যে ভবিষ্যতে যুদ্ধ প্রতিরোধ এবং দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রয়োজন । এই চিন্তা থেকেই জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠা । তাই গত আট দশকেরও বেশি সময় ধরে জাতিসংঘ বিশ্ব শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে নানাভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
1. শান্তিরক্ষা মিশন (Peacekeeping Operations)
বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ এলাকায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী (UN Peacekeepers) পাঠায়। ‘ব্লু হেলমেট’ বা নীল হেলমেট পরিহিত এই বাহিনী বিভিন্ন দেশে যুদ্ধবিরতি তদারকি, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা এবং যুদ্ধোত্তর সমাজে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় কাজ করে।
2. পারমাণবিক অস্ত্র সংবরণ:
স্নায়যুদ্ধ বা কোল্ড ওয়ারের সময় বিশ্বকে পারমাণবিক যুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা করতে এবং ‘পারমাণবিক অপ্রসারণ চুক্তি’ (NPT) বাস্তবায়নে জাতিসংঘ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
3. মানবিক সহায়তা ও শরণার্থী পুনর্বাসন:
বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ, সংঘাত বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে তৈরি হওয়া মানবিক সংকটে জাতিসংঘ সর্বপ্রথম এগিয়ে আসে। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (UNHCR) এবং খাদ্য কর্মসূচি (WFP) বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি নিঃস্ব মানুষকে খাদ্য, বাসস্থান ও চিকিৎসা পৌঁছে দিচ্ছে।
4. মানবাধিকার ও আইন প্রতিষ্ঠা:
1948 সালে ঘোষিত ‘সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র’ (UDHR) বিশ্বজুড়ে মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় একটি অনন্য দলিল। এছাড়া যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং আন্তর্জাতিক আইন বাস্তবায়নে জাতিসংঘের তৈরি আইনগত কাঠামো বিশ্বজুড়ে কাজ করছে।
এছাড়াও জাতিসংঘের অধীনে UNICEF, WHO, UNESCO, UNHCR, WFP-এর মতো বিশ্বখ্যাত বিশেষায়িত সংস্থা ও তহবিল কাজ করছে।
